প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি বিছানাকান্দি। আমার দেখা বাংলাদেশের অনন্য সুন্দর স্থানগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। সম্প্রতি দেশে গিয়ে ঘুরে এলাম প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই পর্যটনকেন্দ্র। সৌন্দর্যের আধার বিছানাকান্দি মূলত একটি বৃহৎ পাথরসমৃদ্ধ এলাকা। সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়নে এর অবস্থান। মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রবল জলধারা এবং স্বচ্ছ পানির বুকে ছড়িয়ে থাকা নানা আকৃতির ধবধবে সাদা পাথর পুরো এলাকাটিকে দিয়েছে এক অনন্য রূপ।
এখানকার দৃষ্টিনন্দন পাথর শুধু পর্যটকদের আকর্ষণই করে না, দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মণ্ডিত এই স্থানটি দেখতে সারা বছরই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা লেগে থাকে। বিছানাকান্দিতে এসে পর্যটকেরা শুধু ছবি তুলে আনন্দ উপভোগ করেন না, বর্ষাকালে স্বচ্ছ শীতল পানিতে সাঁতার কেটেও কাটান আনন্দঘন সময়।
বিছানাকান্দি আমার গ্রামের বাড়ি ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ। সকাল ১১টায় একটি রিজার্ভ বাসে যাত্রা শুরু করে আমরা ৩০ জন সহপাঠী যখন গন্তব্যে পৌঁছালাম, তখন ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ১টা। এই আনন্দভ্রমণের আয়োজন করেছিল এসএসসি ১৯৮৬ ব্যাচ, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা শাখা।
সফরসঙ্গীদের সবাই আমার একসময়ের সহপাঠী হলেও অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে প্রায় এক যুগ পর। বন্ধু বুরহান, দিনার, মালিক, শামীম, আবু সুফিয়ান, হরি, দিলু, হেলাল, সাজিদ, আনছার, অলোক, বিজিত, নিছলিস ও জিল্লুসহ আরও অনেকের সঙ্গে দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়ায় আনন্দটা ছিল অন্য রকম। পুরোনো দিনের স্মৃতি যেন মুহূর্তেই ফিরে এসেছিল।
ফেঞ্চুগঞ্জ-সিলেট মহাসড়ক ধরে আমাদের বাস ছুটে চলল বিছানাকান্দির উদ্দেশে। রাস্তার দুপাশের গগনচুম্বী বৃক্ষরাজি আর চিরচেনা বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ পেছনে ফেলে এগিয়ে চলছিল আমাদের আনন্দযাত্রা। যাত্রাপথে বন্ধুদের অনেকেই সমস্বরে গেয়ে উঠলেন সেই ভাইরাল গান—
“বকুল ফুল, বকুল ফুল, সোনা দিয়া হাত কানও বান্ধাইলি,
শালুক ফুলের লাজ নাই, রাইতে শালুক ফোটে লো…
যার সনে যার ভালোবাসা, সেই তো মজা লুটে লো…”
কেউ কেউ এই আনন্দময় মুহূর্তগুলো স্মরণীয় করে রাখতে ভিডিও ধারণ করছিলেন, কেউবা ক্যামেরায় বন্দি করছিলেন বন্ধুদের হাসিমুখ ও উচ্ছ্বাস। গান, হাসি, গল্প আর আড্ডার মধ্য দিয়ে কখন যে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ পেরিয়ে গেল, তা টেরই পাইনি। বাস থেকে নেমে মিনিট বিশেক নৌকায় চড়ে অবশেষে পৌঁছে গেলাম বিছানাকান্দির মূল আকর্ষণস্থলে।
বিছানাকান্দিতে পৌঁছানোর পর শুরু হলো আনন্দ আর হৈচৈয়ের এক অন্য রকম অধ্যায়। এখানে দাঁড়ালে খুব কাছ থেকেই দেখা যায় ভারত সীমান্তের সুউচ্চ মেঘালয় পাহাড়। বিছানাকান্দির মূল আকর্ষণ হলো পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা পানির প্রবল স্রোত, পাহাড়ি ঝরনার জলধারা আর নীল আকাশে মেঘের অবাধ বিচরণ।
বিছানাকান্দির হিমশীতল পানির স্পর্শ যেন দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি মুহূর্তেই ভুলিয়ে দেয়। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন আকৃতির অসংখ্য পাথর দেখে মনে হয়, প্রকৃতি যেন পুরো এলাকাটিকে জল আর পাথরের এক বিশাল বিছানায় সাজিয়ে রেখেছে। বিছানাকান্দির কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ভারতের সুউচ্চ মেঘালয় পাহাড়, মাথার ওপর নীল আকাশ আর নিচে পিয়াইন নদীর নীলাভ জলের অপূর্ব মিতালি দেখে মনে হয়, পুরো এলাকাটি যেন কোনো চিত্রশিল্পীর তুলিতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস।
এখানে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে যেতে হয়। পাহাড়, পাথর, জলধারা আর আকাশের এমন অপূর্ব সম্মিলন সত্যিই বিস্ময় জাগায়। খোলা চোখে না দেখলে প্রকৃতির এই অনন্য সৃষ্টি উপলব্ধি করা কঠিন। তাই তো অনেকেরই মনে হয়, বিছানাকান্দিতে একবার এলে বারবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে।
বিছানাকান্দি ভ্রমণ শেষে আমার মনে হয়েছে, অবসর কাটানো কিংবা ছুটির আনন্দ উপভোগ করার জন্য এটি হতে পারে এক চমৎকার গন্তব্য। দৃষ্টির শেষ সীমানা পর্যন্ত যতদূর চোখ যায়, চারদিকে শুধু পাথর আর পাথর। প্রকৃতির এমন অনন্য সৌন্দর্য সত্যিই মুগ্ধ করে।
তবে এই অপার সৌন্দর্যের স্বাতন্ত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় সরকার এবং পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা, পরিবেশবান্ধব হোটেল-মোটেল নির্মাণ এবং একটি আধুনিক পর্যটন পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলে বিছানাকান্দি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আরও আকৃষ্ট করতে পারবে। এর মাধ্যমে দেশের পর্যটনশিল্প সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দিনের আলো যখন ক্রমশ নিভে আসছিল, সন্ধ্যার অন্ধকার ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখনও মন চাইছিল না বিছানাকান্দির মায়া ছেড়ে ফিরে আসতে। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য যেন বারবার পেছন থেকে ডাকছিল। তবু ফেরার পথে মন ভরে রইল একরাশ মুগ্ধতা, আনন্দ আর স্মৃতিতে।
ফিরতে ফিরতে মনে পড়ে গেল কবি ও সৈনিক আলী আহসানের লেখা একটি বিখ্যাত কবিতার পঙ্ক্তি—
“কখনও আকাশ যেখানে অনেক হাসিখুশি ভরা তারা,
কখনও সাগর যেখানে স্রোতের তরঙ্গ দিশাহারা।
কখনও পাহাড় যেখানে পাথর চিরদিন জেগে থাকে,
কখনও মাঠ যেখানে ফসল সবুজের ঢেউ আঁকে।”
সত্যিই, বিছানাকান্দি যেন প্রকৃতির সেই অপূর্ব ক্যানভাস, যেখানে পাহাড়, পাথর, জল আর আকাশ মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে এক অনন্য সৌন্দর্যের জগৎ।
এই ভ্রমণ শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র দেখার অভিজ্ঞতা ছিল না; এটি ছিল হারিয়ে যাওয়া বন্ধুত্ব, পুরোনো দিনের স্মৃতি আর সহপাঠীদের সঙ্গে একসঙ্গে কাটানো আনন্দঘন মুহূর্তগুলো নতুন করে ফিরে পাওয়ার এক অসাধারণ উপলক্ষ। জীবনের ব্যস্ততা আর সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে এমন একটি দিন আমাদের সবার স্মৃতিতে দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকবে।
লেখক: কলামিস্ট ও কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট, নিউইয়র্ক।