বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপমুক্ত, স্বাধীন, নির্ভরযোগ্য এবং স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন ও অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করতে সংস্থাটির পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
রোববার রাজধানীর বিবিএস মিলনায়তনে জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য পরিসংখ্যান: টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পনার ভিত্তি’ প্রতিপাদ্যে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
হস্তক্ষেপমুক্ত পরিসংখ্যান ব্যবস্থা গড়ার পরিকল্পনা
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিবিএসের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে, যাতে প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই দায়িত্ব পালন করতে পারে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ চলছে।
তিনি বলেন, নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য পরিসংখ্যান টেকসই উন্নয়ন, কার্যকর পরিকল্পনা এবং সঠিক সরকারি নীতি প্রণয়নের ভিত্তি। সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব থেকে শুরু করে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা—সব ক্ষেত্রেই নির্ভুল তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম।
সরকারি পরিসংখ্যানের ওপর জনগণের আস্থা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, তথ্য হতে হবে জনমুখী, পরিমাপযোগ্য, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য।
তথ্য বিকৃতির বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা
রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক উদ্দেশ্যে পরিসংখ্যান পরিবর্তন বা বিকৃত করার প্রচেষ্টার সমালোচনা করেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, তথ্য-উপাত্তে কারসাজি করলে সরকার প্রকৃতপক্ষে নিজেদেরই বিভ্রান্ত করে। এতে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয় এবং সরকারি কর্মসূচি ও নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
অতীতের পরিসংখ্যানের অসংগতি ও দুর্বলতা শনাক্ত করতে সরকার তথ্যের ফরেনসিক পর্যালোচনা শুরু করেছে বলেও জানান তিনি। তবে এ উদ্যোগকে শুধু আগের সরকারের ভুল খোঁজার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সমস্যার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করতে হলে তথ্যের গভীরে গিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। কোথায় অসংগতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করা গেলে সংশোধনের পথ তৈরি হবে।
রাজনৈতিক গণতন্ত্রের পাশাপাশি অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের ওপর গুরুত্ব
অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নও প্রয়োজন। অর্থনৈতিক গণতন্ত্র ছাড়া রাজনৈতিক গণতন্ত্র কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া কঠিন।
এ কারণে বিবিএসকে আরও শক্তিশালী ও জনমুখী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর মতে, সঠিক তথ্য সহজলভ্য হলে সরকার যথাযথ নীতি প্রণয়ন করতে পারবে, গবেষকেরা অর্থবহ গবেষণার সুযোগ পাবেন এবং বৈষম্য শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
নতুন নীতি গ্রহণের চেয়ে বিদ্যমান নীতির বাস্তবায়নকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে অনেক নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে; কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। এবার সরকার বাস্তবায়নের দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে চায়।
ডিজিটাল অবকাঠামো ও উন্মুক্ত তথ্যের উদ্যোগ
আধুনিক পরিসংখ্যান ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন আমির খসরু। সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া সফরের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার ও জনগণের অগ্রগতিতে ডিজিটাল অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সরকারের ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ওয়ালেট, ওয়ান কার্ড’ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ ধরনের উদ্যোগে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সমন্বিত এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার প্রয়োজন।
পরিসংখ্যান ও গবেষণার তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত করার পক্ষে মত দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়লে জনগণের মতামত, স্বাধীন গবেষণা ও পর্যালোচনার পরিসর বিস্তৃত হবে। এতে ভুলত্রুটি শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি উদ্যোগে তথ্য সংগ্রহ করা হলেও এসব তথ্যের মালিকানা শুধু সরকারের নয়; এর প্রকৃত মালিক জনগণ। তাই তথ্যের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
বিবিএসের জনবল সংকট সমাধানের আশ্বাস
বিবিএসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের, বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে কর্মরতদের দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করেন অর্থমন্ত্রী। সংস্থাটির জনবল সংকট ও অন্যান্য পরিচালনাগত সমস্যার বিষয়েও সরকার অবগত রয়েছে বলে জানান তিনি।
এসব সমস্যা সমাধানে কিছু পদক্ষেপ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আরও উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকারি কর্মকর্তা, পরিসংখ্যানবিদ, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্বাধীন, স্বচ্ছ ও জনমুখী পরিসংখ্যান ব্যবস্থা গড়ে তোলার আশাও প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও যারা উপস্থিত ছিলেন
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহির উদ্দিন স্বপন, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকার। স্বাগত বক্তব্য দেন বিবিএসের মহাপরিচালক মো. শামীমুল হক। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির পরিচালক কবির উদ্দিন আহমেদ।
এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বাংলাদেশ স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদাত হোসেন এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক।