সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা রহস্যময় প্রাণী, বিচ্ছিন্ন উপকূলীয় জনপদ আর পরিবারকে রক্ষার লড়াই—এই তিন উপাদানে দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে কানাডীয় থ্রিলার সিরিজ ‘বিলো’। নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর আন্তর্জাতিক দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলার পাশাপাশি বাংলাদেশেও জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে এসেছে সিরিজটি।
প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মুক্তির প্রথম সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে ১ কোটি ৭০ লাখ ভিউ পেয়েছিল ‘বিলো’। দ্বিতীয় সপ্তাহে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ১২ লাখে। নেটফ্লিক্সের ইংরেজি ভাষার সিরিজের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করা এই সিরিজের সাফল্যের পেছনে রয়েছে রহস্য, পারিবারিক টানাপোড়েন ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংঘাতের গল্প।
সমুদ্রঘেরা শহরে অজানা আতঙ্ক
ছয় পর্বের সিরিজটির গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন ক্যালভিন পেনি। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন জশ হার্টনেট। কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের প্রত্যন্ত উপকূলীয় শহর স্নুকস আর্মের বাসিন্দা ক্যালভিন পেশায় জেলে। শৈশবে বাবার রহস্যময় মৃত্যু এবং জীবনের নানা বিপর্যয় তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। নিজের পরিবারকে একসঙ্গে ধরে রাখাও তাঁর জন্য সহজ নয়।
এমন সময় শহরের সমুদ্রে দেখা দেয় এক অজানা প্রাণী। প্রাণীটির উপস্থিতি স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য হুমকি হয়ে ওঠে। নিজের সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরো জনপদকে রক্ষার চেষ্টায় নামতে হয় ক্যালভিনকে।
এই অনুসন্ধানে তাঁর পাশে দাঁড়ান সামুদ্রিক প্রাণী নিয়ে গবেষণাকারী ফন্ডা হাওয়ান্ডার। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন ম্যাকেঞ্জি ডেভিস। ক্যালভিনের ছেলে ওয়েডের ভূমিকায় রয়েছেন ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’খ্যাত চার্লি হিটন। রহস্যের জট খুলতে গিয়ে সামনে আসে শহরটির অতীত, পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা এবং সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিপদের নানা দিক।
দানবের গল্পের আড়ালে জীবিকার সংকট
‘বিলো’র গল্পে রহস্যময় প্রাণীটি বড় আকর্ষণ হলেও কাহিনি শুধু তাকে ঘিরে আবর্তিত হয়নি। সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল একটি জনপদের মানুষের জীবন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নিজেদের শিকড় আঁকড়ে থাকার সংগ্রামও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
মাছের সরবরাহ কমে যাওয়া ও জীবিকার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার মধ্যে স্থানীয় মানুষের সামনে নতুন করে বসতি গড়ার প্রস্তাব আসে। জমি ছেড়ে ক্ষতিপূরণ নেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। কেউ পরিবর্তনের মধ্যে নতুন সম্ভাবনা দেখেন, আবার কেউ পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে যেতে চান না।
এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই সমুদ্রের অজানা প্রাণী নতুন বিপদ তৈরি করে। ফলে গল্পটি নিরাপত্তা ও শিকড়ের টান, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সামষ্টিক দায়িত্ব এবং প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল মানুষের অসহায়ত্বের মতো বিষয় সামনে আনে।
জলবায়ু পরিবর্তন, স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবিকার অনিশ্চয়তার বিষয়গুলোও গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আলাদা করে বক্তৃতা দেওয়ার বদলে রহস্য ও পারিবারিক সংকটের মধ্য দিয়ে এসব বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করেছে সিরিজটি।
কেন দর্শকদের আগ্রহ বাড়ছে
সিরিজটির অন্যতম আকর্ষণ অজানা প্রাণীটির পরিচয় ও তার আক্রমণ ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্য। প্রাণীটি কখন আক্রমণ করবে, শহরের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী এবং অতীতের ঘটনাগুলোর সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন দর্শককে পরের পর্ব দেখার আগ্রহ জোগায়।
ক্যালভিন কোনো অপরাজেয় নায়ক নন। অতীতের শোক, রাগ, ব্যর্থতার বোধ এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ তাঁকে একই সঙ্গে শক্তিশালী ও দুর্বল করে তোলে। বিপদের মুখে তাঁর পরিবর্তন চরিত্রটিকে মানবিক করে তুলেছে।
পাথুরে উপকূল, কুয়াশা, ধূসর আকাশ ও উত্তাল সমুদ্র গল্পে তৈরি করেছে অস্বস্তিকর পরিবেশ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের বদলে প্রকৃতির সামনে মানুষের সীমাবদ্ধতা এখানে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
বাবা-ছেলের সম্পর্ক, পারিবারিক ভাঙন, পুরোনো শোক এবং শহরের মানুষের পারস্পরিক অবিশ্বাসও গল্পকে এগিয়ে নিয়েছে। ছয় পর্বের সীমিত পরিসর হওয়ায় অল্প সময়ে পুরো কাহিনি দেখার সুযোগও দর্শকদের কাছে সিরিজটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
জশ হার্টনেটের অভিনয়
ক্যালভিন পেনি চরিত্রে জশ হার্টনেটের অভিনয় সিরিজটির অন্যতম আলোচিত দিক। ‘পার্ল হারবার’, ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’ ও ‘পেনি ড্রেডফুল’-এর মতো কাজের জন্য পরিচিত এই অভিনেতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘ওপেনহেইমার’ ও ‘ট্র্যাপ’-এর পর ‘বিলো’তে তিনি এমন এক জেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যার মূল শক্তি মানসিক দৃঢ়তা ও পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা।
ক্যালভিনের মধ্যে জেদ, অসহায়ত্ব, রাগ ও গভীর মমতার সহাবস্থান রয়েছে। নিজের দুর্ভাগ্যকে নিয়তি হিসেবে মেনে নেওয়া মানুষটি সংকটের মুখে দায়িত্ব নিতে শেখেন। চরিত্রটির এই পরিবর্তন ফুটিয়ে তোলার সুযোগ পেয়েছেন হার্টনেট।
অন্যদিকে ফন্ডা হাওয়ান্ডারের চরিত্রে ম্যাকেঞ্জি ডেভিস গল্পে যুক্ত করেছেন অনুসন্ধানী মনোভাব ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। চার্লি হিটনের অভিনীত ওয়েড চরিত্রের মাধ্যমে পরিবারের সংকটের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের উদ্বেগও উঠে এসেছে।
নির্মাণে কানাডার উপকূলীয় জীবনের ছাপ
সিরিজটির নির্মাতা কানাডীয় চিত্রনাট্যকার জেসি ম্যাককিওন। ‘দ্য আমব্রেলা একাডেমি’ ও ‘১৯-২’ সিরিজের সঙ্গে লেখক হিসেবে যুক্ত ছিলেন তিনি।
পরিচালনায় রয়েছেন জেমি চাইল্ডস, হেলেন শেভার ও স্টিফেন ডান। চিত্রনাট্য রচনায় কাজ করেছেন কারেন ওয়ালটন, পেরি শ্যাফে ও ন্যাট্টি জাভিৎস।
নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডরের বিভিন্ন স্থানে সিরিজটির শুটিং হয়েছে। সেন্ট জনস, ব্রিগাস সাউথ ও পাউচ কোভের মতো জায়গা ব্যবহার করা হয়েছে দৃশ্যধারণে। স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের জীবনযাপন ও ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা নিতে নির্মাতারা স্থানীয় সংগঠনগুলোর সহায়তাও নিয়েছেন।
সমুদ্রের অজানা প্রাণীটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের মাধ্যমে প্রাণীটির উপস্থিতি পর্দায় বাস্তবসম্মত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ভিউয়ের নতুন মাইলফলক
নেটফ্লিক্সের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম সপ্তাহে ১ কোটি ৭০ লাখ ভিউ পাওয়ার পর দ্বিতীয় সপ্তাহে ‘বিলো’র ভিউ বেড়ে ২ কোটি ১২ লাখে পৌঁছায়। সিরিজটি ৫৩টি দেশের তালিকায় প্রথম স্থান এবং ৯০টি দেশের সেরা দশে জায়গা পেয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশেও সিরিজটি নেটফ্লিক্সের সাপ্তাহিক জনপ্রিয় সিরিজের তালিকায় জায়গা করে নেয়। ৫ থেকে ১১ অক্টোবরের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে থাকা ‘বিলো’ পরে শীর্ষে উঠে আসে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
সমুদ্রের দানবকে ঘিরে রহস্যের সঙ্গে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে যুক্ত করেই ‘বিলো’ আন্তর্জাতিক দর্শকদের মনোযোগ ধরে রেখেছে। এর জনপ্রিয়তা দেখাচ্ছে, অজানা আতঙ্কের গল্পের পাশাপাশি মানবিক সম্পর্ক ও বাস্তব জীবনের সংকটও দর্শকদের কাছে সমান আকর্ষণীয় হতে পারে।