ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে আজ মঙ্গলবার ভোট দেবেন দেশটির নাগরিকেরা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন, নাকি বিরোধী শিবির নতুন সরকার গঠনের সুযোগ পাবে—এই নির্বাচনে তারই পরীক্ষা হবে। তবে ভোটের ফল প্রকাশের পরও নতুন সরকার গঠনে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
ইসরায়েলের ৭৮ বছরের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবারের ভোটকে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, আঞ্চলিক সংঘাত ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব ভোটারদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে। নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুদ্ধকালীন সরকারের ভূমিকা নিয়েও ভোটারদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী। এবারের নির্বাচনে তাঁর লিকুদ পার্টি ও ডানপন্থী মিত্রদের সঙ্গে বিরোধী শিবিরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ তীব্র। তবে কোন পক্ষ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে পারবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কখন ভোট, কারা দিতে পারবেন
ইসরায়েলে নির্বাচনের দিন সরকারি ছুটি থাকে। দেশটির অধিকাংশ এলাকায় স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণের কথা রয়েছে। কিছু ছোট জনপদ, হাসপাতাল ও কারাগারে ভোটের সময়সূচি ভিন্ন হতে পারে।
ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ইসরায়েলি নাগরিকেরা ভোট দিতে পারবেন। সাধারণত ভোটারদের নির্ধারিত কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে হয়। সেনাসদস্য ও কারাবন্দীদের মতো কিছু শ্রেণির ভোটারের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে।
ইসরায়েলে বিদেশে অবস্থানরত সাধারণ নাগরিকদের জন্য ডাকযোগে ভোট দেওয়ার প্রচলিত ব্যবস্থা নেই। বিদেশে অবস্থানরত অধিকাংশ নাগরিককে ভোট দিতে হলে দেশে ফিরতে হয়। তবে কূটনীতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে বিদেশে থাকা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য ব্যতিক্রম রয়েছে।
দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের ভোটদানের হার এবং দলগুলোর প্রাপ্ত ভোট নির্বাচনের ফল ও পরবর্তী সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইসরায়েলের নির্বাচনপদ্ধতি কেমন
ইসরায়েলের পার্লামেন্টের নাম নেসেট। এর মোট আসন ১২০টি। নির্বাচনে ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না; তাঁরা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীতালিকার পক্ষে ভোট দেন। দেশজুড়ে প্রতিটি দল যে পরিমাণ ভোট পায়, তার অনুপাতে পার্লামেন্টে আসন বণ্টন করা হয়।
কোনো দলকে নেসেটে আসন পেতে মোট বৈধ ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ অর্জন করতে হয়। এই সীমার নিচে থাকা দলগুলো আসন পায় না।
সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী হবেন—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। সরকার গঠনের জন্য তাঁকে অন্য দলগুলোর সমর্থন নিয়ে কার্যকর সংসদীয় জোট তৈরি করতে হয়। এ কারণেই নির্বাচনে প্রথম হওয়া এবং সরকার গঠন করা দুটি আলাদা বিষয়।
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল ৪ নভেম্বরের মধ্যে প্রকাশের কথা রয়েছে।
কীভাবে গঠিত হয় নতুন সরকার
ইসরায়েলের কোনো দল এককভাবে ১২০ আসনের নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। তাই দেশটিতে সাধারণত একাধিক দলের সমন্বয়ে জোট সরকার গঠন করা হয়। সরকার গঠনের জন্য সাধারণত অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন হয়।
আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে একজন আইনপ্রণেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন। সাধারণত যিনি সরকার গঠনের সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনা দেখাতে পারেন, তাঁকেই এই দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তি জোট গঠন ও সরকার গঠনের জন্য প্রাথমিকভাবে ২৮ দিন সময় পান। প্রয়োজন হলে তিনি আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানোর আবেদন করতে পারেন।
প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য একজন আইনপ্রণেতাকে সুযোগ দিতে পারেন। পরবর্তী প্রচেষ্টাগুলোও ব্যর্থ হলে এবং কোনো প্রার্থী সরকার গঠনে সক্ষম না হলে নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সরকার গঠনের জন্য প্রার্থীকে নেসেটে নিজের সরকার ও নীতিগত কর্মসূচি উপস্থাপন করতে হয়। সংসদীয় অনুমোদন পাওয়ার পরই নতুন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, অতীতে দেশটিতে সরকার গঠনে ২০ থেকে ১০০ দিন পর্যন্ত সময় লেগেছে। ফলে নির্বাচনের দিনেই নতুন প্রধানমন্ত্রী কে হচ্ছেন, তা নিশ্চিত হওয়া নাও যেতে পারে।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কারা
নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। তিনি মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নিরাপত্তা, সরকারের জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রশ্নে তিনি বিরোধী শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছেন।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সঙ্গে কট্টর ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট রয়েছে। এই জোটের ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ভর করবে দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা এবং ছোট দলগুলোর নির্বাচনী ফলের ওপর।
বিরোধী শিবিরও একক নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদের নেতৃত্বাধীন জোটসহ বিভিন্ন বিরোধী দল আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। ফলে নেতানিয়াহুবিরোধী ভোট বেশি হলেও তা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংসদীয় সমর্থনে রূপান্তরিত হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কোন বিষয়গুলো ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে
এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি বড় ইস্যু। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং দুই শতাধিক মানুষকে জিম্মি করা হয়। এর পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। হতাহতের সংখ্যা ও যুদ্ধের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন হিসাব প্রকাশিত হয়েছে।
নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচকেরা ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা, যুদ্ধ পরিচালনা এবং নিরাপত্তা নীতির জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকেরা নিরাপত্তা ও সামরিক নীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এ ছাড়া ইরানকে ঘিরে সংঘাত, অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের ছাড় এবং নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলাও নির্বাচনী আলোচনায় রয়েছে।
ফলের পরও থাকতে পারে রাজনৈতিক অচলাবস্থা
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর জোট ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া গেছে। তবে জরিপের ফল সরাসরি নির্বাচনী ফল নির্ধারণ করে না। ছোট দলগুলোর ভোট, ন্যূনতম আসন পাওয়ার সীমা এবং জোট গঠনের সক্ষমতা চূড়ান্ত পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।
কোনো পক্ষই ৬১ আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে দীর্ঘ আলোচনা ও দর-কষাকষি চলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলও সরকার গঠনে ব্যর্থ হতে পারে।
তাই এবারের নির্বাচনে শুধু কে বেশি ভোট পেলেন, সেটিই নয়—কে কার্যকর জোট গঠন করে নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিশ্চিত করতে পারবেন, সেটিই নির্ধারণ করবে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন, নাকি ইসরায়েলে নতুন নেতৃত্বের সূচনা হবে।