সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
সিলেটের খবর

বিদেশে প্রদর্শনীর প্রলোভন, সিলেটে ৮০০ শিক্ষার্থীর টাকা আদায়ের অভিযোগ

ডেস্ক রিপোর্ট • ৬ ঘণ্টা আগে • পঠিত: ৩০ বার
বিদেশে প্রদর্শনীর প্রলোভন, সিলেটে ৮০০ শিক্ষার্থীর টাকা আদায়ের অভিযোগ
বিদেশে শিশুদের আঁকা ছবি প্রদর্শনী, আন্তর্জাতিক সনদ ও পুরস্কারের আশ্বাস দিয়ে সিলেটে প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘কেপিআর ইন্টারন্যাশনাল আর্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। পুরস্কার বিতরণীর নামে নামবিহীন ক্রেস্ট দেওয়া এবং নতুন করে বিদেশের প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের ফর্ম বিক্রির ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। পরে পুলিশ দুই আয়োজককে আটক করে। জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আদায় করা টাকা উদ্ধার করে সরকারি হেফাজতে রাখা হয়েছে।

রোববার (২৫ অক্টোবর) সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এ ঘটনা ঘটে। আটক ব্যক্তিরা হলেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক পরিচয়দানকারী লালমনিরহাট সদরের মৃত আনোয়ার হোসেনের ছেলে মো. ইমরান খান (৩৭) এবং মুনমুন খাতুন (৩১)। পুলিশ জানায়, তাঁরা ঢাকার আশকোনার তালতলায় বসবাস করেন। লিখিত অঙ্গীকারের পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

বিদেশে ছবি প্রদর্শনীর প্রচার

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটে শিশুদের আঁকা ছবি জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছিল। প্রচারে চীনের বেইজিং, নেপালের কাঠমান্ডু, ভারতের কলকাতা, কানাডা, মালদ্বীপ, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কায় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর কথা উল্লেখ করা হয়। বিদেশে যেতে না পারলেও কুরিয়ারে সনদ ও ট্রফি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকেরা।

স্কলার্সহোম, শাহজালাল জামেয়া ও সিলেট গ্রামার স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ছবি সংগ্রহ করা হয়। অভিভাবকদের ভাষ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে খবর পেয়ে তাঁরা জনপ্রতি ৩০০ টাকা করে নিবন্ধন ফি দেন। এভাবে প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মোট ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়।

নামবিহীন ক্রেস্ট, এরপর ফর্ম বিক্রি

পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে শিফটভিত্তিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। আমন্ত্রণপত্রে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ছবির প্রদর্শনীর কথা থাকলেও বাস্তবে এসব আয়োজন ছিল না বলে অভিযোগ করেন উপস্থিত অভিভাবকেরা।

তাঁদের দাবি, শিশুদের দেওয়া ক্রেস্টে নামের পরিবর্তে আয়োজক ইমরান খানের ছবি ছাপানো ছিল। এরপর সাউন্ড সিস্টেমে ঘোষণা দিয়ে ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশে ছবি প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার সুযোগের কথা জানানো হয়। অভিভাবকদের অভিযোগ, এসব প্রদর্শনীতে অংশ নিতে নতুন ফর্ম বিক্রি শুরু করেন আয়োজকেরা। প্রতি ফর্মের দাম ৫০০ টাকা এবং কানাডার প্রদর্শনীর ফর্মের দাম ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

এ নিয়ে উপস্থিত অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তাঁরা আয়োজকদের আটকে রেখে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন।

বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন অভিভাবকদের

অভিভাবক মো. আবদুর রকিব জানান, তাঁর মেয়ে স্কলার্সহোমের টিলাগড় ক্যাম্পাসে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। স্কুল থেকে তাঁকে জানানো হয়েছিল, তাঁর মেয়ে বিজয়ী হয়েছে এবং শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে পুরস্কার নিতে হবে। সেখানে কোনো স্থানীয় অতিথিকে দেখতে পাননি বলে দাবি করেন তিনি।

আবদুর রকিবের অভিযোগ, নামবিহীন ক্রেস্ট দেওয়ার পর আয়োজকেরা ৫০০ ও ১ হাজার টাকার ফর্ম বিক্রি শুরু করেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তাঁরা জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন।

আরেক অভিভাবক আমিনুজ্জামান জোহাহির বলেন, প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুমতিপত্র দেখতে চাইলে ইমরান খান অস্বস্তিতে পড়েন এবং ভিডিও ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। তাঁর দাবি, ফর্ম বিক্রির দায়িত্বে থাকা এক নারীকে ইমরান নিজের স্ত্রী পরিচয় দিলেও ওই নারী নিজেকে সহকর্মী বলে পরিচয় দেন।

আমিনুজ্জামানের আরও অভিযোগ, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার পর আয়োজক দলের দুজন ক্যাশের টাকা নিয়ে চলে যান। স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এমন আয়োজনের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

প্রশাসনের হস্তক্ষেপে টাকা উদ্ধার

সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও অভিভাবক সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি জানার পর জেলা প্রশাসক ও এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হেফাজতে নেয়।

সিলেট জেলা জাসাসের সাধারণ সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রায়হান হোসেন খান জানান, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছিল। আটক ব্যক্তিদের থানায় নেওয়ার পর অভিভাবকেরা মামলা করার পরিবর্তে টাকা ফেরত পাওয়াকে অগ্রাধিকার দেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মাসুদ রানার হস্তক্ষেপে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। পরে ওই অর্থ জেলা কালচারাল অফিসারের ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হয়।

রায়হান হোসেন খান আরও জানান, মিলনায়তন ভাড়া বাবদ ২৫ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিপত্র জারির প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।

সিলেট জেলা কালচারাল অফিসার আল মামুন বিন সালেহ বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ঢাকার কেন্দ্রীয় শিল্পকলা একাডেমি থেকে মিলনায়তন বরাদ্দ নিয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসন এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। উদ্ধার করা টাকা তাঁর সরকারি ব্যাংক হিসাবে জমা রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর প্রধান শিক্ষকদের মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে।

সতর্ক থাকার আহ্বান প্রশাসনের

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদ রানা বলেন, ঘটনা জানার পর তাঁরা দ্রুত হস্তক্ষেপ করেন। তাঁর ভাষায়, এটি একটি ভুঁইফোড় সংগঠনের অপচেষ্টা ছিল। অভিভাবকদের প্রধান দাবি ছিল টাকা ফেরত পাওয়া। সে কারণে পুরো অর্থ উদ্ধার করে সরকারি হেফাজতে রাখা হয়েছে।

অজানা প্রতিষ্ঠানের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন বা বিদেশে পুরস্কার পাওয়ার প্রতিশ্রুতিতে বিভ্রান্ত না হয়ে শিশুদের কোনো কার্যক্রমে যুক্ত করার আগে প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করার আহ্বান জানান তিনি।

এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সহিদুর রহমান বলেন, ৯৯৯-এ ফোন পাওয়ার পর আম্বরখানা ফাঁড়ির পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং দুজনকে আটক করে। জেলা প্রশাসনের উপস্থিতিতে উদ্ধার করা টাকা কালচারাল অফিসারের হেফাজতে দেওয়া হয়। সিলেটে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড না করার লিখিত অঙ্গীকার নেওয়ার পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সংবাদটি শেয়ার করুন:
Facebook Twitter WhatsApp