শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
লেখাজোঁকা

৭ই নভেম্বরের গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

আহবাব চৌধুরী খোকন • ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৩২ রাত • পঠিত: ৮০ বার
৭ই নভেম্বরের গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত এই দিনটি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাহসিকতা, দেশপ্রেম ও নেতৃত্বের কারণে।

জিয়াউর রহমান ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সম্মুখসারির বীর সেনানায়ক। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে তিনি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিকামী মানুষকে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে সম্মুখযুদ্ধে তাঁর সাহসী নেতৃত্ব ও সামরিক দক্ষতা তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর এই আত্মনিবেদনই ছিল তাঁর দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের অন্যতম উজ্জ্বল পরিচয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর দেশে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। দেশ ও সেনাবাহিনীতে তখন অনিশ্চয়তা, উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে ৬ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে সিপাহিদের মধ্যে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। অভ্যুত্থানকারী সিপাহিরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার উদ্যোগ নেন। অবশেষে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তিনি। সিপাহিদের উচ্ছ্বাস এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আনন্দমিছিল বের হয়। জিয়াউর রহমানের মুক্তি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করে।

৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের প্রকৃত প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি শুধু একজন মুক্তিপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান হিসেবেই আবির্ভূত হননি; বরং ধীরে ধীরে দেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে চলে আসেন। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল করা এবং রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বনির্ভর অর্থনীতি ও প্রশাসনিক গতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দর্শনের অংশ হয়ে ওঠে। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৭৯ সালের সংসদীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুদলীয় রাজনীতির নতুন পরিসর তৈরি হয়। এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের বিশেষত্ব ছিল সামরিক অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধের সাহসিকতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবমুখী উদ্যোগের সমন্বয়। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়ার এই যাত্রা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তাঁর শাসনামল ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক ও ভিন্নমত থাকলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব অনস্বীকার্য।

৭ নভেম্বর তাই শুধু একজন সেনাপ্রধানের বন্দিদশা থেকে মুক্তির দিন নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেতৃত্বের পরিবর্তন ও নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনাবিন্দু। মহান মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের সাহসিকতা এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বের প্রভাব বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সংবাদটি শেয়ার করুন:
Facebook Twitter WhatsApp

সম্পর্কিত খবর

০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৪ সকাল
২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৫ রাত
১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫০ রাত