বিদেশের মাটিতে বসবাসরত প্রতিটি বাংলাদেশিকে দেশের প্রতিনিধি হিসেবে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, প্রবাসীরা জাপানের ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং ইতিবাচক দিক তুলে ধরলে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) স্থানীয় সময় বিকেলে জাপানের টোকিওতে হোটেল নিউ ওতানিতে প্রবাসী বাংলাদেশি ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। বাংলাদেশ কমিউনিটি ইন জাপান আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রবাসীরা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন করেন। সভায় তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
জাপানি বিনিয়োগ আনতে প্রস্তুতি বাড়ানোর তাগিদ
বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে জাপানের সরকারি নেতৃত্ব ও ব্যবসায়ী মহলের আগ্রহের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও বিনিয়োগ সম্প্রসারিত হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, তরুণদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
প্রবাসীদের প্রতি তাঁর আহ্বান, জাপানি ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাঁরা যেন বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরেন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখেন।
জনকল্যাণমুখী সংস্কারে গুরুত্ব
সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়ন—এমন বক্তব্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে, এমন সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নের প্রসঙ্গে তিনি আগামী প্রজন্মের জন্য যুগোপযোগী শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তা ও ট্রাফিক সচেতনতা শেখানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন।
স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে মানসম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া এবং চিকিৎসা গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করাই কার্যকর সংস্কারের অন্যতম লক্ষ্য।
পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা
পরিবেশ সংরক্ষণ ও বায়ুদূষণ মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর সরকারি কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সবুজায়ন বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় তুলে ধরেন তিনি। পানির সংকট মোকাবিলায় খাল পুনঃখনন এবং পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এ ক্ষেত্রে অতীতে নেওয়া খাল খনন কর্মসূচির অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করে কর্মসংস্থান
তরুণদের বেকারত্ব কমাতে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করার বিষয়েও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের উদ্যোগে ৫০০টির বেশি বন্ধ মিল-কারখানা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৭ সালের মধ্যে ৪৬টি বড় রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা চালুর প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানান।
সরকারের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিল্প উৎপাদন বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
সংস্কার বাস্তবায়নে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনকল্যাণমূলক সংস্কার বাস্তবায়নে বাধা মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হবে। যেসব উদ্যোগ সাধারণ মানুষ ও তাঁদের সন্তানদের জীবনমান উন্নত করবে, সেগুলোকে সমর্থন দেওয়ার জন্য প্রবাসীসহ দেশের সব মানুষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা তুলে ধরেন, যেখানে প্রতিটি শিশু মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসা পাবে, পর্যাপ্ত খাবারের সুযোগ পাবে এবং বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারবে। গণতান্ত্রিক, স্বাবলম্বী ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনে সবার সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রবাসীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব
মতবিনিময় সভায় প্রবাসীরা জাপানি ভাষা শিক্ষা, শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করা, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধি এবং ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় জাপান বিএনপির নেতারাও অংশ নেন।
প্রবাসীদের সঙ্গে এ মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে দেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও জনকল্যাণমূলক সংস্কারে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।