বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশ

পদ্মা ব্যারাজে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানির সংকট কমানোর আশা

ডেস্ক রিপোর্ট • ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১৪ সকাল • পঠিত: ১০ বার
পদ্মা ব্যারাজে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানির সংকট কমানোর আশা
৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার প্রকল্পে ১৯ জেলার নদী পুনরুজ্জীবন, সেচ ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মোকাবিলা, নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। রাজবাড়ীর পাংশায় মূল অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। 

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পদ্মা অববাহিকার বিভিন্ন নদীর প্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার, কৃষিজমিতে সেচের পানি সরবরাহ, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার প্রভাব কমানো এবং সুন্দরবনের মিঠাপানির প্রবাহ উন্নত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সুফল কতটা অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের কারিগরি বাস্তবায়ন, পানির প্রাপ্যতা ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার ওপর।

১৯ জেলার নদীব্যবস্থায় পরিবর্তনের লক্ষ্য

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের ১৯টি জেলা এর আওতায় আসবে। হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতীসহ গুরুত্বপূর্ণ নদীব্যবস্থার প্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। 

সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি সংরক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন নদী ও সেচব্যবস্থায় সরবরাহ করা। এতে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি চলমান গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্প এবং প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পে সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।

লবণাক্ততা ও সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলা

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে মিঠাপানির স্বল্পতা ও লবণাক্ততা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। নদীতে পর্যাপ্ত মিঠাপানির প্রবাহ না থাকলে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পানীয় জলের প্রাপ্যতা এবং উপকূলীয় পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ানো গেলে এসব এলাকায় লবণাক্ততার চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের মিঠাপানিনির্ভর বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃসঞ্চয়ন এবং যশোরের ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে নদীর প্রবাহ বাড়লেই সব এলাকায় লবণাক্ততা বা জলাবদ্ধতা দূর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। পানির বণ্টন, নিষ্কাশনব্যবস্থা, নদীতে পলি জমা এবং স্থানীয় ভূপ্রকৃতির বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

কী থাকছে প্রকল্পের অবকাঠামোয়

প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা নদীর ওপর প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, দুটি ফিশ পাস এবং নৌযান চলাচলের জন্য নেভিগেশন লক রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে গাইড বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ বাঁধও নির্মাণ করা হবে। 

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনায় প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের সক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা, সক্ষমতা ও চূড়ান্ত নকশা সম্পর্কে প্রকল্পের অনুমোদিত নথির সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অর্থনীতি ও কৃষিতে সম্ভাব্য প্রভাব

পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খাতে বছরে প্রায় ৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফলের মধ্যে রয়েছে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নদীকেন্দ্রিক জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি।

তবে এ ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা প্রকল্পের পূর্বাভাস; বাস্তবায়নের পর প্রকৃত অর্জন নির্ভর করবে পানি সরবরাহ, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের পরিবর্তন, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং পরিবেশগত প্রভাবের ওপর।

বাস্তবায়ন ও উদ্বোধন নিয়ে কী জানা যাচ্ছে

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের ধারণা নিয়ে কয়েক দশক ধরে সমীক্ষা ও পরিকল্পনার কাজ হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পটি ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে অনুমোদন পায়। এর অর্থায়ন সরকারি তহবিল থেকে করার কথা রয়েছে। 

গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর পাংশায় প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের সময় পানি সম্পদমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করতে পারেন। এটি সম্ভাব্য সময়সূচি; উদ্বোধনের চূড়ান্ত তারিখ সরকারিভাবে ঘোষণা করা হলে তা নিশ্চিত হবে। 

পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় রাখার তাগিদ

পদ্মা ব্যারাজ থেকে প্রত্যাশিত সুফল পেতে হলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি পরিবহন, ভাটির পানির প্রাপ্যতা, মাছের চলাচল এবং নদীভাঙনের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ব্যারাজের কারণে পানি সংরক্ষণ ও বণ্টনের ধরন বদলালে তার প্রভাব উজান ও ভাটির উভয় অঞ্চলে পড়তে পারে।

এ কারণে নির্মাণের পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেজিং, তীর সংরক্ষণ, নদীর প্রবাহ পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এসব বিষয় সামলানো গেলে প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করার সম্ভাবনা বাড়বে।

পদ্মা ব্যারাজ তাই শুধু একটি অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প নয়; এটি দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, নদী ও পরিবেশ রক্ষার একটি বড় উদ্যোগ। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে পরিকল্পিত সুবিধাগুলো বাস্তবে কতটা অর্জিত হয় এবং পরিবেশগত ঝুঁকি কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তার ওপর।
সংবাদটি শেয়ার করুন:
Facebook Twitter WhatsApp