বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে বেসরকারি কোম্পানির আধিপত্য। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস পিএলসি দেশের মোট চাহিদার সামান্য অংশ সরবরাহ করে। ফলে বাজারে সরবরাহ ও দামের ওপর বেসরকারি কোম্পানিগুলোর প্রভাব বেশি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে দাম নির্ধারণ করলেও খুচরা বাজারে সেই দামে গ্যাস পাওয়া নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে এলপিজি সরবরাহ ও মূল্যব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে ভারতে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি তেল বিপণন কোম্পানি এলপিজি বাজারের বড় অংশ পরিচালনা করে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য রয়েছে সরকারি ভর্তুকি। ফলে বাংলাদেশে এলপিজির ক্রমবর্ধমান দাম এবং বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে তুলনা তৈরি হয়েছে।
দুই মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা
বিইআরসির নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। ৪ অক্টোবর তা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়। সর্বশেষ ২ নভেম্বর আরেক দফা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকা।
অর্থাৎ দুই মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা, যা প্রায় ৩০ শতাংশ। শুধু নভেম্বরেই দাম বেড়েছে ২২৩ টাকা। বিইআরসির ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন মূল্য ২ নভেম্বর রাত ৮টা থেকে কার্যকর হয়েছে।
তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সরবরাহ সংকট ও বাজারে তদারকির ঘাটতির কারণে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু দাম ঘোষণা নয়, বাজারে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের বাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন প্রতিষ্ঠানের প্রাধান্য
ভারতের এলপিজি বাজারে বড় ভূমিকা রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানের। এগুলো হলো ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন, ভারত পেট্রোলিয়াম ও হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম। প্রদত্ত বাজার-হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান তিনটির বাজার অংশ যথাক্রমে ৪৫ দশমিক ২৩, ২৭ দশমিক ৪৯ ও ২৭ দশমিক ২৮ শতাংশ।
ভারতে এলপিজির দাম নির্ধারণ ও বিপণনে সরকারি নীতির প্রভাব থাকায় নির্দিষ্ট শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে দেশটিতে সব গ্রাহক সমান হারে ভর্তুকি পান না; সুবিধা নির্ভর করে গ্রাহকের যোগ্যতা ও সরকারি প্রকল্পের ওপর।
ভারতে ভর্তুকির সুবিধা পান দরিদ্র পরিবার
ভারতে সাধারণত ১৪ দশমিক ২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়। ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে দিল্লিতে এর খুচরা মূল্য ৯৪২ রুপি। কলকাতায় দাম ৯৬৮ রুপি। রাজ্যভেদে কর ও অন্যান্য কারণে দামে পার্থক্য রয়েছে।
দরিদ্র পরিবারের জন্য ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ‘প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা’। ২০১৬ সালে চালু হওয়া এ প্রকল্পের আওতায় যোগ্য পরিবারগুলোকে এলপিজি সংযোগ দেওয়া হয়। প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা নির্দিষ্ট শর্তে সিলিন্ডারপ্রতি ৩০০ রুপি ভর্তুকি পান। বছরে সর্বোচ্চ ১২টি সিলিন্ডারের জন্য এ সুবিধা প্রযোজ্য বলে সরকারি কর্মসূচিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন রাজ্য সরকারও নিজস্ব উদ্যোগে এলপিজি সহায়তা দিয়ে থাকে। তবে এসব সুবিধা সারা দেশের সব গ্রাহকের জন্য প্রযোজ্য নয়।
বাংলাদেশে এলপিজি কার্ডের ঘোষণা, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশে এলপিজির দাম বাড়ার মধ্যে নিম্ন আয়ের পরিবারকে সহায়তা দিতে ‘এলপিজি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২৭ এপ্রিল তিনি এ উদ্যোগের কথা জানান। তবে ঘোষণার পরও প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এলপিজি বাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ বাড়ানো, বেসরকারি কোম্পানির বাজার তদারকি এবং দরিদ্র গ্রাহকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি চালু করা গেলে ভোক্তাদের ওপর দামের চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর দামের তুলনা
প্রতিবেদনে সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে ১২ কেজি এলপিজির সমপরিমাণ সিলিন্ডারের দাম বাংলাদেশের তুলনায় কম। তবে দেশভেদে সিলিন্ডারের ধারণক্ষমতা, কর, ভর্তুকি ও বিনিময় হার আলাদা হওয়ায় সরাসরি তুলনায় সতর্কতা প্রয়োজন।
প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী, নেপালে ১৪ দশমিক ২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ নেপালি রুপি। ১২ কেজির সমপরিমাণ গ্যাসের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৭৪১ রুপি বা ১ হাজার ৪২৮ টাকা। ভুটানে ১৪ দশমিক ২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৯ ভারতীয় রুপি; ১২ কেজির সমপরিমাণের মূল্য প্রায় ৮৭৮ রুপি বা ১ হাজার ১৫৩ টাকা।
পাকিস্তানে ১১ দশমিক ৮ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৩ হাজার ৪৭০ পাকিস্তানি রুপি। সে হিসাবে ১২ কেজির সমপরিমাণের দাম প্রায় ৩ হাজার ৫২৮ রুপি বা ১ হাজার ৫৮৮ টাকা। শ্রীলঙ্কায় ১২ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৪ হাজার ৩৬৫ শ্রীলঙ্কান রুপি। ১২ কেজির সমপরিমাণের মূল্য প্রায় ৪ হাজার ১৯০ রুপি বা ১ হাজার ৫৭০ টাকা।
সব মিলিয়ে এলপিজির বাজারে শুধু সরকারি মূল্য নির্ধারণই যথেষ্ট নয়। সরবরাহব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি, ন্যায্য দামে বিক্রি নিশ্চিত করা এবং নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা চালু করাই এখন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।